শুরুর কথা
সিদ্ধান্ত নিলাম আবার কক্সবাজার যাবো। সময় জুন ২০১৯ ঈসায়ী। আমি, রাজু, শাকিল, আরাফাত, তাসফিদ, সোহাগ, আর সোহাগের এক ভাই নাম মুন্না, এই সাতজন যাবো। মুন্নার সাথে সেইবারই আমাদের প্রথম পরিচয়। তাই সোহাগের ভাই বলে পরিচয় দিতে হলো। বরাবরের মত রাজু ট্যুর ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে। ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে একটা বহুল পরিচিত বাস সার্ভিসের টিকেট কিনে আগেই সব গুছিয়ে রেখেছে। টিকেটের কোনো ঝামেলা নেই, আমরা শুধু বাসে উঠে বসব।
যাত্রার দিন এলো, ২০ জুন ২০১৯। সন্ধায় আমি, তাসফিদ, সোহাগ আর আরাফাত ধানমন্ডি সোবহানবাগে মিলিত হলাম সায়েদাবাদ যাওয়ার জন্য। ডিজিটাল রাইড সেবা দেয় এমন এক ট্যাক্সি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের ট্যাক্সি ডেকে নিলাম সায়েদাবাদ যাওয়ার জন্য। আগেকার দিনের ট্যাক্সির সাথে এই ট্যাক্সির পার্থক্য শুধু এইযে, আগে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্যাক্সি ডাকতে হতো, এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকেই ডাকা যায়। দুনিয়া এগিয়ে গেছে। ট্যাক্সি আসলে তাতে চেপে বসলাম। বাকিরা যার যার জায়গা থেকে সময়মত বাস টার্মিনালে এসে যাবে। ঢাকার রাস্তার ট্র্যাফিক ঠেলে সায়েদাবাদ পৌঁছলাম রাত ন’টায়।
![]() |
| তাসফিদ খাচ্ছে। আমরা বসে আছি। |
![]() |
| আমি লুঙ্গি পোজ দিচ্ছি। |
![]() |
| বাসের জন্য বসে আছি। |
![]() |
| যাত্রা শুরু হলো। |
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের গল্প
আমরা বাসা থেকে খেয়ে বের হলেও তাসফিদ যথারীতি না খেয়েই বের হয়েছে। যথারীতি বললাম এই কারণে যে ও বরাবরই একটু ছন্নছাড়া, কোনো কাজই ঠিকমত করে না। হয়ত দেখা গেল আপনি গুরুত্বপুর্ণ কোনো কাজে ওর জন্য কোথাও দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, ও দিব্যি ভুলে বসে আছে, বা আসতে ইচ্ছা হলো না, তো ফোন বন্ধ করে রেখে দিয়েছে, আপনি আর তার নাগাল পেলেননা, যত গুরুত্বপুর্ণ কাজই হোক না কেন। কক্সবাজার যাওয়ার দিন ও এসেছে সেই ময়মনসিংহ থেকে। বুঝুন অবস্থা!
যাই হোক, ওর খাওয়ার জন্য যাত্রী ছাউনির পাশেই এক রেস্টুরেন্টে গেলাম। সেখানে আমাদের তিনজনকে দেখে ওয়েটার যতটা খুশি হয়েছিলো, একজনের খাবার অর্ডার করতে দেখে ততটাই মনমরা হয়েছিলো বোধ করি। খাওয়া পর্ব শেষে আমরা যাত্রী ছাউনিতে যেয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। এর মধ্যেই সবাই চলে এসেছে, শুরু হয়েছে ফটোসেশন পর্ব। কেউ সিগারেট মুখে দিয়ে, কেউ সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে, একটু স্যাভেইজ ভাব নিয়েই সবাই পোজ দিচ্ছিলো।
আমি বরাবরের মত একটু উদ্ভট হতে চেষ্টা করছিলাম অবশ্য। এই যাত্রায় সেই উদ্ভটতা ফুটিয়ে তোলার জন্য আমি লুঙ্গি পরে ছিলাম। আমার কাজ হচ্ছে লুঙ্গি পরে অন্যদের চেয়ে নিজেকে কতটা আলাদা করে তোলা যায় সেই চেষ্টা করা। আমি লুঙ্গি পোজ দিচ্ছিলাম। আমাদের বাসের সময় ছিলো রাত ১০ঃ৩০টা, কিন্তু ১১টা বেজে গেলেও বাস আসার কোনো নামগন্ধও নেই। বাস আসলো রাত সেই ১২টায়। এরমধ্যে যতবারই আমরা কাউন্টারের লোকদের বাসের কথা জিজ্ঞেস করতে যাই ততবারই মনে হয় তাঁরা আমাদের পারলে ধরে মারে। মানে “তুই বেটা বাসের টিকেট কিনেছিস, বাসতো কিনে নিসনি, তুই এতবার বাসের কথা জিজ্ঞেস করবি কেন” এমন একটা ভাব। আমরা বাধ্য হয়ে তাদের সেই ভাবকেই মেনে নিলাম, শত হলেও তাঁরা বাংলাদেশের পরিবহন মালিক সমিতির লোক! ওদের সাথে বারবার ন্যায্য কথা বলতে যাওয়ার সাহস না দেখানোই ভালো। আমরা সেখানে বসে টিভিতে খেলা দেখার প্রয়াস চালাতে লাগলাম।
সেদিন আবার ২০১৯ একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বিশ্বকাপের বাংলাদেশ বনাম অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার খেলা চলছিলো। প্রথমে ব্যাটিং করে অস্ট্রেলিয়া ৩৮১ রানের বিশাল স্কোর দাঁড় করায়, এবং বরাবরের মতই এত বিশাল স্কোর দেখে বাংলাদেশের খেলোয়াররা সেই স্কোর টপকাতে পারবে না ধরে নিয়ে প্রথমেই জয়ের আশা ছেড়ে দিয়ে খেলা দেখা বন্ধ করে দিই (আশা ছেড়ে দিয়ে চেষ্টা গুটিয়ে নেওয়া আমাদের চিরন্তন স্বভাব)।
হঠাৎ দেখি মুশফিকুর রহিম সাথে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে বেশ পেটাচ্ছে, রান এগিয়ে নিচ্ছে বেশ জোর গতিতেই। এই দেখে আবার খেলা দেখায় মনোযোগ দিলাম (আমরা সুবিধাবাদী, দুধের মাছি স্বভাব যেটাকে বলে)। আর যায় কই! শুরু হলো ওয়েটিং রুমে হৈ-হুল্লোড়। মার ছক্কা, মার চার বলে আমরা সেখানকার অবস্থা মাথায় তুলে নিলাম প্রায়। বাংলাদেশ প্রায় জিতেই যাচ্ছিলো, মুশফিক আর মাহমুল্লাহ'র ব্যাটিং দেখে একটা সময় তাই মনে হচ্ছিলো। পরে হঠাৎ করেই ছন্দপতন, শেষমেশ বাংলাদেশ ৩৩৩ রানের একটা "সম্মানজনক" স্কোর দাঁড় করাতে পেরেছিলো। বাংলাদেশের ৪৮ রানের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেদিনকারমত খেলা শেষ হলো।
যাত্রা হলো শুরু
একটু পরে আমাদের বাস চলে এলো, ১০:৩০টার বাসে রাত ১২টায় উঠে বসার পর আমাদের কক্সবাজার যাত্রা শুরু হলো। দেখা যাক সামনে কী আছে। সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে বাস বের হতে একটু সময় ক্ষেপণ হয়, সাধারণত তাদের অনেকগুলি স্টপেজ থাকে শুরুতে, এবং প্রতিটা থেকে লোক নেওয়া শেষ হতে যা একটু দেরি। গাড়ি একবার ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়েতে উঠতে পারলেই ভোঁ-দৌড়।
আরেকটা কথা, বাংলাদেশী ভ্রমণপিয়াসু মানেই জানে যে বাংলাদেশী হাইওয়ে বাস ড্রাইভাররা খুব র্যাকলেস(Reckless) হয়। র্যাকলেসের বাংলা কী হয়? বেপোরোয়া বলা যায়। তবে আমার কাছে র্যাকলেস টার্মটাই বেশ যুতসই লাগে। একটা গাম্ভীর্য আছে। বাস চলছে, সায়েদাবাদ পার হয়ে যাত্রাবাড়ী ধরে সাইনবোর্ড পর্যন্ত একটু বিরক্তিকর। একটু পর পরই বাস থামে। তারপর মূলত শুরু হয় আসল চলা। খুব দক্ষ না হলে রাতের বেলায় হাইওয়েতে গাড়ি চালানো আর আত্মহত্যা একই কথা।
সাধারণত র্যাকলেস হলেও এই রোডের ড্রাইভাররা একই সাথে বেশ দক্ষও হয়ে থাকে বটে। দাউদকান্দি পার হয়ে কুমিল্লার কাছাকাছি পড়তেই আমার হঠাৎ খুব পেশাবের বেগ হলো, রাত তখন দুইটা। সামনে যেয়ে ড্রাইভার সাহেবকে অনুরোধ করতেই তিনি রাস্তার মাঝে বাস থামালেন। সুনশান রাস্তা, ভাবলাম যাক মানুষের সামনেতো আর পেশাব করতে হবে না। এই ভেবে রাস্তার পাশেই বসে পড়লাম (আর কোনো উপায় ছিলো না তখন)। হঠাৎ কী করে কোথ্যেকে রাস্তার মাঝে এত মানুষ এসে হাজির। পরে বুঝতে পারলাম, আশে পাশেই কোনো গার্মেন্টস ছিলো, সেখানের কর্মীরা ঠিক তখনই তাদের ওভারটাইম ডিউটি শেষ করে বের হচ্ছিলো। কী এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড দেখুনতো!
কুমিল্লায় যাত্রা বিরতি
বাস আবার চলছে। চলতে চলতে এগিয়ে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। চট্টগ্রামগামী সব বাসেরই কমন যাত্রাবিরতির জায়গা হচ্ছে কুমিল্লা। সে সুবাদে হাইওয়ের পাশে প্রচুর রেস্টুরেন্ট। একটা তথ্য দিই, এইসব হাইওয়ে রেস্টুরেন্টের প্রায় সবগুলোতেই গলাকাটা দাম রাখে। আপনি বুদ্ধিমান হলে যাত্রার আগে বাসা থেকে বা নিজের এলাকা থেকেই মাঝপথে খাওয়ার জন্য কিছু নিয়ে যাবেন। সেটাই সব দিক দিয়ে সুবিধাজনক। আর আমাদের মত যারা ছাত্রাবস্থায় ভ্রমণে বের হোন, তাদের জন্যতো এটা আবশ্যক। আর যাই হোক, আমাদের মত ছন্নছাড়াদের ভ্রমণের সময় বিলাসিতা মানায় না। কুমিল্লার আরেকটা "ভয়াবহ" মজার ব্যাপার আছে।
কুমিল্লাতে ঢুকলেই দেখবেন যে সীমানার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শয়ে শয়ে মাতৃ ভাণ্ডার মিষ্টান্নের দোকান। কুমিল্লার মাতৃ ভাণ্ডারের রসমালাই সারা দেশব্যাপী জনপ্রিয় হওয়ায়, আহাম্মক ও অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের সবার দোকানের নাম মাতৃ ভাণ্ডার রেখে দিয়েছে। এই হাদারামগুলি যদি জানত যে, মানুষ তাদের এমনসব কর্মকাণ্ডে হাসাহাসি করে, এতে করে তাদের ব্যবসায়িক কোনো লাভই হচ্ছে না, তাহলে হয়ত ওরা এইসব করত না।
অবশ্য করত না যে তাও না, আমরা বাঙালিরাতো নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে উস্তাদ। হয়ত তারা সবই বুঝে, শুধু আসল মাতৃ ভাণ্ডার যেন বাইরের কেউ না চিনে সেজন্যও এমন অপচেষ্টা হতে পারে। আমাদের দ্বারা সবই সম্ভব। আরেকটা ব্যাপার আছে, কুমিল্লাকে ইদানিং একদল অতি উৎসাহী জনগণ স্বপ্রণোদিত হয়ে ব্যঙ্গ করে মুতিল্লা বলে ডাকা শুরু করেছে। এর কারণ হিসেবে ওরা বলে সবাই যাত্রাবিরতিতে কুমিল্লায় নেমে নাকি পেশাব করে। তাই বলে মুতিল্লা ডাকবে! এ ভারী অন্যায়!
![]() |
| কুমিল্লায় যাত্রাবিরতি |
গন্তব্য বদল
যাত্রা আবার শুরু হলো। খুব ভোরেই আমরা চট্টগ্রাম পার হলাম। তখন পর্যন্ত সব ঠিক ছিলো। চট্টগ্রাম পেরিয়ে বড়ইতলী ইউনিয়ন নামে একটা জায়গায় দ্বিতীয়বারের মত যাত্রা-বিরতি দিলো। তখনই হুট করে শাকিল বলে বসলো কক্সবাজার যাবে না। সামনে চকোরিয়া নেমে কুতুবদিয়ার দিকে যাবে। আমি তেমন আনন্দদায়ক কিছু পেলাম না ওর প্রস্তাবে। আমার কথায় আবার কক্সবাজারের সিদ্ধান্তই হলো। যেই না বাস চকোরিয়ার কাছাকাছি হলো, ওরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো নেমে যাবে। কী আর করা, পড়েছি মুঘলের হাতে, খানা খেতে হবে সাথে। জোয়ার যেদিকে, আমাকেও সেদিকে গা ভাসাতে হলো। পরে অবশ্য এই সিদ্ধান্তই আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলো। সেদিন শাকিল এইভাবে কুতুবদিয়ার জন্য জোর না করলে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতাম। সে গল্প সামনে।
সকাল আটটার দিকে আমরা চকোরিয়া নেমে পড়লাম। সেখান থেকে সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ঠিক করলাম চকোরিয়া থেকে মগনামা ঘাট পর্যন্ত। দামাদামি করে প্রতি সিএনজি ৩০০ টাকায় রফা হলো। আমরা দুইটা সিএনজি নিলাম। সিএনজি চলতে শুরু হতেই সে এক প্রাকৃতিক শোভার মনোরম দৃশ্যের শুরু হলো। প্রাণ জুড়ানো অবস্থা যাকে বলে। আমি যদিও গ্রামের ছেলে, প্রকৃতির কোলেই আমার বেড়ে উঠা, তবু এ দেশের প্রতিটা অঞ্চলের প্রকৃতি আমাকে নতুন করে টানে। সব জায়গাকেই নতুন লাগে, মনে হয় আল্লাহ্ তায়’লা এই জায়গাটাকে বুঝি আরো সুন্দর করে বানিয়েছেন। সকাল নয়টার আগেই আমরা মগনামা ঘাটে পৌঁছে গেলাম। সেখানে দুইভাবে সাগর পাড়ি দেওয়া যায়। ইঞ্জিনের ট্রলার আর স্পিডবোট।
আমরা বেশ অনেকক্ষণ সেখানে বসে, প্রচুর ছবি তুলে, নৌকার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পরে ভাবলাম, না থাক, স্পিডবোটেই যাই। আমরা স্পিডবোট একটা রিজার্ভ করে নিলাম। সম্ভবত ১৬০০ টাকা ছিলো ভাড়া। আরাফাত, রাজু, সোহাগ এরা আবার সাঁতার জানে না। অবশ্য সাঁতার জানাতেও আসলে তেমন লাভ নেই। উন্মাদ সমুদ্রে নৌকাডুবি হলে সাঁতার জানলেই বা কী! বোট ছাড়লো। শুরু হলো নতুন এক রোমাঞ্চ। সমুদ্রের বুকে এই প্রথম স্পিডবোট তথা এমন ছোট কোনো জলযানে উঠলাম। একবার বোট উপরে উঠে, একবার নিচে নামে। সে কী রোমাঞ্চ, রক্তে অন্য এক ধরণের উন্মাদনা।
বাতাসের তীব্রতায় সবাই মাথায় নুইয়ে রেখেছি। সবার মনেই অজানা আশঙ্কা। বোটের ক্যাপ্টেনের দিকে চেয়ে দেখি সে দিব্যি স্বাভাবিক আছে। সমুদ্রই যার ঘরবাড়ি, সমুদ্রে সে কী ডরে? তিরিশ মিনিটের সমুদ্র যাত্রা শেষ করে আমরা যখন বড়ঘোপঘাট পৌঁছলাম, তখন সমদ্রের আরেক রূপ দেখলাম। মনে হচ্ছিল, সমুদ্র তার সব রাগ ঘাটে নিয়েই বুঝি উগরে দিচ্ছে। মাতাল ঢেউয়ে ঘাটের অবস্থা টলমল। খুব কসরত করে আমরা বোট থেকে নামলাম। নেমেই মনে হলো, যদি না আসতাম, কী জানি হারাতাম।
কুতুবদিয়া। চতুর্দশ শতাব্দীর শেষের দিকে সমুদ্রের বুকে জেগে উঠা কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত এক দ্বীপ। এই দ্বীপের আয়তন ২৭ বর্গ কিলোমিটার। হিসেবমতে এই দ্বীপের বয়স ছয়শো বছর পেরিয়ে গেছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে এই দ্বীপে মানুষের আগমন শুরু হয়। মগ আর পর্তুগিজদের বিতারিত করে কুতুবুদ্দিন নামক এক কামেল ব্যক্তি আলী আকবর, আলী ফকির ও তাঁর আরো কিছু সঙ্গী নিয়ে এই দ্বীপে আস্তানা গাড়ে। জরিপে দেখা যায় আনোয়ারা, বাঁশখালী, চকোরিয়া, সাতকানিয়া, পটিয়া অঞ্চল থেকে এই দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের আগমণ।
নির্যাতিত মুসলিমরা কুতুবুদ্দিনের প্রতি শ্রদ্ধাবনত হয়ে এইদ্বীপের নাম রাখে “কুতুবুদ্দিনের দিয়া”। পরবর্তীতে এর নাম হয় কুতুবদিয়া। স্থানীয়রা দ্বীপকে “দিয়া” বা “ডিয়া” বলে। ১৯১৭ সালে বৃটিশ সরকার এখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করে। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে এই দ্বীপে উপজেলা স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের একমাত্র লাইটহাউজ এই দ্বীপেই অবস্থিত। এখানের জীবিকার প্রধান উৎস মাছ ধরা, লবন চাষ ও শুঁটকি মাছ তৈরি। তবে বছরের এপ্রিল থেকে জুনের সময়টাতে ইলিশের প্রজননের জন্য তাদের সরকারিভাবে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। এই সময়ে মাছ ধরার উপর নির্ভরশীল প্রায় সবাই বেকার থাকে। আয়ের উৎসও বন্ধ থাকে। এই দ্বীপে একটি বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রও রয়েছে।
![]() |
| কুতুবদিয়ার বড়ঘোপঘাট নামার পর। |
হোটেল ভাড়া পর্ব
চমৎকার পরিবেশ হোটেলের। একেবারেই কোলাহল শূন্য। আমরা ছাড়া সারা হোটেলজুড়ে আর একটা রুমেই কেবল পর্যটক ছিলো। তবে দ্বীপে প্রথাগত বিদ্যুৎ নেই। যা আছে সেটা হচ্ছে বায়ু বিদ্যুৎ, সৌর বিদ্যুৎ আর জেনারেটর। দ্বীপের বেশিরভাগ পরিবারই সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। যাই হোক, প্রথমেই আমরা যেটা করলাম, হোটেলের বিশাল ছাদে একটু দৌড়ঝাঁপ করলাম। আমাদের রুম ছিলো চতুর্থ তলায়, এবং চারতলার তিন চতুর্থাংশ জোড়াই ছাদ। আর আমরা উত্তেজনার দরুন দুপুরের কাঠপোড়া রোদেই ছাদে লাফালাফি করলাম। অবশ্য কারণও ছিলো। ছাদ থেকে বিশাল সমুদ্রের পাড় ও বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখা যায়, যতদূর চোখ যায় ততদূর। এবং সেটা মনে এমন এক আবেদন সৃষ্টি করে, যার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকা অসম্ভব। কী রোদ, আর কী ঝড়-বৃষ্টি!
বেশ কিছুক্ষণ সময় ক্ষেপণ করে আমরা রুমে ঢুকে গোসল সেরে নিলাম। অবশ্য এর মধ্যেও ছেলে-পেলেরা যা যা করেছে, সবকিছুর বর্ণনা না দেওয়াই ভালো। গোসল কার্য শেষ হতে হতেই দুপুর প্রায় গড়িয়ে গেল। আমরা একটু অসময়েই হোটেলের রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। তাদের আয়োজন খুব সাদামাটা। গরু, মুরগি, হাঁস, আলুর ভর্তা, ডাল আর ভাত। গরু, আলু ভর্তা, ডাল আর ভাতের অর্ডার করে হোটেলের বিশাল বারান্দায় আমরা বসলাম। সবাই সিগারেট ধরিয়ে সাগরের পানে চেয়ে বসে আছি। সে এক ঘোর লাগা পরিবেশ। সাগরের খোলা বাতাসের সাথে বন্ধুদের আড্ডা। প্রায় চল্লিশ মিনিট সময় চলে গেল চোখের পলকেই। খাবারের ডাকা এলো, খুব আয়েশ করে খেয়ে-দেয়ে সেখানেই বসেই আরেক রাউন্ড আড্ডা। যাক আরো কিছুটা সময়।
পায়ে হেটে দ্বীপ দর্শন
খাওয়া পর্ব শেষ করে সেখানেই সামান্য বিশ্রাম নিয়ে আমরা বের হলাম সমুদ্র পাড়ে। আমরা এখানে এক রাত থাকার চিন্তা করেই এসেছি। তাই যতটা পারা যায় ঘুরে দেখতে হবে। সমুদ্রের পাড় ঘরে দক্ষিণ দিকে হাঁটা ধরলাম। হোটেল থেকে বেরুতেই সমুদ্রের পাড়ে গরুর হাট পেলাম। সেদিন তাদের হাটবার ছিলো। এর আগে কখনো সমুদ্রের পাড়ে এমন হাট দেখার অভিজ্ঞতা হয়নি। গরুর হাট ছাড়িয়ে সামনে এগুলাম। একটু সামনেই ছোট একটা বন। ছায়াঘেরা জায়গা। সেখানে কিছুটা সময় কাটালাম। ছবি তুললাম অনেক। স্থানীয় এক ভদ্রলোক তার পিচ্চি মেয়েকে নিয়ে বসেছিলো বালিতে, অনুমতি নিয়ে তাদেরও একটা ছবি তুললাম। আরাফাত বেয়ে গাছে উঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো।
কী আর করা, গাছে উঠার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে আবার সামনে এগুলাম। সামনে এগিয়ে বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি পেলাম যেখানকার গাছ সম্ভবত ঝড়ে উড়িয়ে নিয়ে গেছে। সেইসব গাছের গুঁড়িতে আপত্তিকর ভঙ্গিতে পোজ দিয়ে রাজু কিছু ছবি তুললো, যদিও ফটোগ্রাফার ছিলাম আমি। একসাথে আরো কিছু ছবি তুলে সামনে এগুলাম। আমার আবার সবসময়ই একটু যদি তোলার বাতিক। যদিও নিজের ছবি না, প্রকৃতি বা অন্যান্যদের ছবি তুলে দিতেই আমি বেশি পছন্দ করি। কিছুটা সামনে এগিয়েই ভালো একটা ফ্রেম পেলাম। ওদেরকে দাঁড় করিয়ে, আমি তপ্ত বালিতে শুয়ে বিভিন্নরকমের কিছু ছবি তুললাম সবার। এমন করলে আর চলছে না। তাই এবার ছবি তোলা বাদ দিয়ে ক্রমশ সামনে এগুলাম। হাঁটার মধ্যেই প্রকৃতির ছবি তুলে নিচ্ছিলাম যা পারি।
হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকখানি রাস্তা পাড়ি দিলাম সমুদ্রের পাড় ধরে। যদিও এই দ্বীপে এসেই নাকি সবাই লাইট হাউজের দিকে ছুটে, আমরা যাওয়ার সময় করে উঠতে পারলাম না। হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম একদম বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে। বাতাসের অভাবে বড় বড় ফ্যান স্থির হয়ে ছিলো। কিছু কিছু আবার নষ্ট হয়ে পড়েছিলো। লবন চাষের জমি দেখলাম। স্থানীয় ছেলে-ছোকড়ারা ক্রিকেট খেলছিলো, আমরা খেলতে চাইলাম, নেয়নি। হাঁটতে হাঁটতে আমাদের অবস্থা কাহিল। শরীরের উপরের জামা যা ছিলো খুলে ফেললাম। সে এক ভয়ানক অবস্থা। আর কিছুটা সামনে যেতেই গাছের ছায়া পেলাম। সেখানেও কিছু স্থানীয় যুবকের দেখা পেলাম। ওদের সাথে বসে আড্ডা দিলাম কিছুক্ষণ।
অল্পতেই তাঁরা আপন করে নিলো আমাদের। সেখানে কিছুক্ষণ বসতেই দেখলাম বাতাস পেয়ে বায়ু বিদ্যুতের বিশাল বিশাল ফ্যানগুলি ঘুরছে। সেখানে অনেকটা সময় কাটিয়ে মেইন রোডের দিকে হাঁটা ধরলাম। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়, হোটেলরুমে ফেরার পালা এবার। রাস্তায় এসে টেম্পু পেয়ে গেলাম। একটানে হোটেলের সামনে এনে নামিয়ে দিলো। সন্ধ্যায় আমরা আমাদের হোটেল থেকে সমদ্রের পাড় ধরে উত্তর দিকে যতটা যাওয়া যায় গেলাম। সূর্যাস্ত দেখলাম। এই সূর্যাস্ত আমাকে টানে, এক অপার্থিব টান। সূর্যাস্তের সময় সূর্যের দিকে চেয়ে থাকলে মনে হয় অন্য এক জগতে বিচরণ করছি। হোক সেটা সম্নুদ্রের পাড় কিংবা নদীর পাড়, অথবা আমার গাঁয়ের ফসলি ক্ষেতের ধারে।
সন্ধ্যার পর ফিরে এসে বড়ঘোপ বাজারে পরোটা দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। খাবারের পাট চুকিয়ে হোটেলের ছাদে বসে গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা দিলাম। হোটেলের চল্লিশ ফুট উপর থেকে রাতের সমুদ্র এক ভয়াবহ মায়াবী পরিবেশ ডেকে এনেছে। যেই অপার্থিব পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, আমি সেটাকে অসহ্য সুন্দর বলি। এমন অসহ্য সুন্দরে আমার কিছুটা সমস্যা হয়। কী করব ভেবে পাইনা। নিজেকে কিছুটা উদভ্রান্তের মত লাগে সেই মুহূর্তে। এই পরিবেশেই কাটালাম গভীর রাত পর্যন্ত। পরে মনে হলো দুইদিন ধরে কারো ঘুম নেই। এবার একটু ঘুমানো উচিত। সেদিনের মত ঘুমিয়ে পড়লাম।
![]() |
| সাগরতীরে গরুর হাট। সারাদিনের ঘুরাঘুরি |


ফেরার সময় হলো
পরদিন সকাল হতেই সমুদ্রে নামলাম। সমুদ্রে কিছুক্ষণ গা ভিজিয়ে হোটেলে এসে গোসল করে আবার হাঁটতে বের হলাম। সেদিন আমরা চলে আসব। যতটা পারি উত্তরের দিকটা একটু দেখে নেওয়া আরকি। সমুদ্রের পাড় ও স্থানীয়দের বাড়ির পাশ ধরে হাঁটলাম। একটা টং দোকানে বসে চা খেলাম, বয়স্কদের সাথে কথা বললাম। সাধারণত সেখানে খুব কম ট্যুরিস্ট যায়। আমাদের দেখে তাঁরা মনে হয় বেশ মজা পেয়েছে। পরে আমরা আবার রোদের মধ্যেই সমুদ্র পাড়ে নামলাম। গরমের অত্যাচারে আমি পরনের লুঙ্গি খুলে মাথায় বেঁধে নিলাম। পাঠক লজ্জা পাবেন না, আমার লুঙ্গির নিচে হাফপ্যান্ট ছিলো। জায়গাটা ছেড়ে আসতে হবে মায়ায় পড়ে গেছিলাম। তাই যতটা পারা যায় ঘুরছিলাম। স্থানীয়দের একটা মজার ব্যাপার এখনো বলি নি। প্রান্তিক শ্রেণির প্রায় সব পরিবারের লোকেরাই সমুদ্রের পাড়ে তাদের প্রাকৃতিক কাজ সারে। আপনি পাড় ধরে যেখানেই যাবেন, মনুষ্য মলের স্তুপ দেখতে পাবেন।
ফিরে আসার দিন সকালবেলা।
এবার ফেরার পালা। ফেরার আগে না বলা কথাটা বলা যাক। প্রথমদিন হাঁটার সময় এক জেলে কন্যার মায়ায় পড়েছিলাম। যতক্ষণ দেখা যায়, হাঁটতে হাঁটতে সেই কন্যার দিকেই চেয়েছিলাম। সে ও কি আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো? নাহ, তা হবে কেন! আমার ভ্রম হয়েছিলো হয়ত। মনে মনে গেয়েছিলাম,
হে সমুদ্র কন্যা,
আজ বুঝি বহালে প্রেমের বন্যা।
হোটেল থেকে আসার সময় খুঁজে পেতে একটা ইঞ্জিনচালিত নসিমন নিলাম। খোলা গাড়িতে কোরাস গাইতে গাইতে ঘাটে চলে এসেছি। স্পীডবোটে আবার মগনামা ঘাট। সেখান থেকে আমরা কক্সবাজার গিয়েছিলাম অবশ্য। তবে সে গল্প আরেকদিন করব, লিখতে লিখতে কুতুবদিয়ার স্মৃতি মনে পড়ে গেছে । স্মৃতি কাটাতে হবে সময় নিয়ে।








































0 Comments