শুরুর কথা:
২৬ অগাষ্ট ২০১৫। সেদিন আমরা ভার্সিটির তৃতীয় সেমিস্টারের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে লেকে আড্ডায় বসেছি। আমি, শাকিল, রাজু আর তুহিন। গল্প হচ্ছে, কথা হচ্ছে। কার পরীক্ষা কতটুকু খারাপ হয়েছে, পরের সেমিস্টারে কেমন করে পড়ে পড়ে একদম ফাটিয়ে দেবো সেই প্রতিজ্ঞা চলছিল। কথায় কথায় সময় তখন বিকেল ৫ টা।
হুট করেই আমি প্রস্তাব করলাম যে চল আমরা বরিশাল যাই। সারারাত লঞ্চ জার্নি, গান, আড্ডা আর পরদিন বরিশালের এখানে সেখানে ঘুরে আবার পরের রাতে ফিরতি লঞ্চ ধরবো। এরমধ্যে শাকিল বলল যে না চল সিলেট যাই। ভাবলাম সিলেটও খারাপ না, সেখানেই তাহলে সই। যেই ভাবা সেই কাজ। ভ্রমণে যাবো, টাকাতো লাগবে। যার যার পকেটে হাত দিলাম, একেকজনের পকেটের সে কী অবস্থা! যার যেমনই তাও আছে, কিন্তু তুহিনের পকেটে আছে মোটে দশ টাকা। সে এক যা তা অবস্থা! পরে সব টাকা কীভাবে ব্যবস্থা হলো সে গল্প আরেকদিন করা যাবে। মূল গল্পে ফিরি।
এবার পালা আরো দুয়েকজনকে রাজি করানো। ফোন দিলাম আরাফাতকে, এ ব্যাটাকে বুঝিয়ে শুজিয়ে রাজি করিয়ে গেলাম রিহানের বাসার নিচে। ওকে ফোন দিয়ে বাসার নিচে নামালাম। বললাম, চল সিলেট যাবো। শুনেই সে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়লো। যা যা দরকার সেগুলির একটা তালিকা করতে মনোনিবেশ করলো (আমাদের এই বন্ধুবর বেশ শৌখিন মানুষ)। ঐদিকে গেলাম পরে শাকিলের বাসায়। ওর বাসা থেকে যা যা নেয়ার নিয়ে আমরা আবার একত্রিত হলাম ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। সেখান থেকে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ঢাকা বিমানবন্দর রেলস্টেশন।
যাত্রা শুরুর আগে:
আমি প্রস্তাব দিলাম মিরপুর হয়ে যাওয়ার জন্য (তখন কিছুদিন হয় মিরপুর থেকে কালশী হয়ে বিমানবন্দরের নতুন রাস্তা হয়েছে, তাছাড়া আমার বাসাও মিরপুর, যাত্রাপথে বাসা হয়ে কিছু দরকারী জিনিসপাতি নিয়ে নেয়া যাবে।)। বাসে মিরপুর রওনা হলাম। মিরপুর দশ নম্বর এসে প্রস্তাব দিলাম আমার বাসায় যাওয়ার জন্য। রাজু আর তুহিন গেল আমার সাথে।
শাকিল, আরাফাত আর রিহান রয়ে গেলো মিরপুর দশ নম্বর ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। বাসায় যেয়ে আমার কাকির ক্যামেরাটা প্রথমে ব্যাগে ঢুকালাম। সাথে কিছু দরকারি কাপড়চোপড় নিলাম (রাজু আর তুহিনের সাথে শুধু পরনের কাপড় ছিলো, অতিরিক্ত আর কোনো কাপড় ছিলো না)। যাই হউক, বাসায় গোসল-টোসল করে রওনা দিলাম মিরপুর দশের দিকে। সেখান থেকে বাসে উঠে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন। মাঝখানে, যে জ্যাম পাশ কাটানোর জন্য মিরপুর দিয়ে ওদের নিয়ে গেলাম, সেই জ্যামের জন্যই রাস্তায় সবার রক্তচক্ষুর শিকার হলাম!
যখন স্টেশন পৌঁছোই তখন রাত ৯টা। রাস্তার পাশের এক খোলা রেস্তোরায় রাতের খাবার খেয়ে, গল্প-আড্ডায় অনেক সময় ক্ষেপণ করে রাত ১১ টায় গেলাম টিকেট কাউন্টারে। কাউন্টারে যেয়ে সিলেটের টিকেট চাইতেই বলল যে রাত ১০ঃ৪৫ টায় আজকের শেষ ট্রেনটি সিলেটের উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। একরাশ হতাশা চেপে ধরলো। সিদ্ধান্ত নিলাম আজকে আর বাসায় ফিরছি না। সকালে ট্রেন এলে তখন ট্রেনে চেপে বসবো। যেই ভাবা সেই কাজ। এক প্যাকেট তাস নিয়ে বসে গেলাম স্টেশনের এক পিলারের নিচে। খেলা শুরু হলো।
আজকে একটা হেস্তন্যাস্ত করেই ছাড়বো এমন ভাব। সময়ে সময়ে ঘড়িতে তখন রাত ১২ঃ২০ টা। দেখলাম ঢাকার দিক থেকে হুট করেই একটা ট্রেন ঢুকলো স্টেশনে (ট্রেন স্টেশনে ঢোকার আগে থেকে গতি কমিয়েছিলো)। ট্রেনের সাথে আমরা দৌড়াচ্ছি। এই ফাঁকেই টিসিকে জিজ্ঞেস করলাম ট্রেন কোথায় যাবে। বলল চট্টগ্রাম; আর কোনো দিকে চাওয়া নেই, দৌড়ে উঠে গেলাম চলন্ত ট্রেনে ।
যাত্রা হলো শুরু:
দৌড়ের মধ্যেই আমরা ভাড়া নিয়ে দামাদামি করলাম টিসির সাথে (দুই দিকের জন্যই এটা অবৈধ আসলে, কারণ আমরাও টিকেট কাটিনি, হুট করেই উঠে গিয়েছি, আর টিসি সাহেবও এক টাকাও সরকারকে দেবেনা)। তো সাধারন ভাড়া যেখানে ৩৫০ টাকা সেখানে আমাদের ভাড়া ঠিক হলো জনপ্রতি ২০০ টাকা করে। আমাদেরকে শুধু কোনোমতে চট্টগ্রাম নিয়ে নামাবে। শুরু হলো এক রোমাঞ্চকর, কষ্টকর ও হাস্যকর যাত্রা। আমরা দাঁড়ালাম গিয়ে রেলের রান্নাঘরের পাশে স্টোররুমে।
নেই কোনো বসার জায়গা, দুইটা আসন তাও আছে তবে সেখানে বসার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা ট্রেনের মেঝেতে খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে গেলাম আবার তাস খেলতে। খেলি, খেলার ফাঁকে দাঁড়াই। উশখুশ করি একটু পরপর, কারণ আমারা যা অস্বস্তিকর অবস্থায় আছি! এদিকে শুরু হলো আরেক বিড়ম্বনা, শাকিলের আমাশয়। কিছুক্ষণ পরপর ট্রেনের ওয়াশরুমে দৌড়। সে কি যন্ত্রণা, আমরা এদিকে দুঃখের মধ্যে হাসি। এভাবেই শুরু হলো আমাদের ট্রেন যাত্রা। সারারাত আমরা একটু একটু ঝিমুই, কম্পার্ট্মেন্টের বাইরে যেয়ে সিগারেট খাই, আবার ভেতরে ঢুকি, কৌতুক বলি, গান গাই। আমার ঝুলি থেকে মোটামুটি কিছু গান আর কৌতুক ছাড়লাম। ঐদিকে শাকিলের অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। আল্লাহকে ডাকছে আর পেট চেপে ধরছে। সারারাত বসার জন্য কোনো আসন পাইনি। এভাবেই আমরা রাতটা পার করে দিলাম।
সকালের সূর্য উঠার আগেই ট্রেন কয়েকটা স্টেশন ধরলো, অনেক যাত্রী নেমে গেলো এবং আমরাও বসার জন্য কিছু আসন খালি পেয়ে গেলাম। ভোরে ক্রসিং পড়লো একটা, আমাদের ট্রেন রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো অন্য ট্রেনের ক্রসিংয়ের জন্য। এই ফাঁকে আমরা ট্রেন থেকে নেমে বেশ কিছু ছবি তুললাম। আবার যাত্রা শুরু হলো। প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছি, এমন সময় আমার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো। ঐদিকে আমার ক্যামেরা দিয়ে রিহান আর রাজু সারা দুনিয়ার ফটোগ্রাফি ও ভিডিয়োগ্রাফি করে করে চার্জ শেষ করে দিয়েছে। ট্রেন থেকে নেমে দেখি ক্যামেরায় আর কোনো চার্জ অবশিষ্ট নেই। যাই হউক, ট্রেন থেকে নামার সময় আরও বিড়ম্বনা। আমরা নামলাম চলতি ট্রেন থেকেই, স্টেশন গেইটের একটু দূরে, কারণ ঐযে আমাদের কাছে কোনো টিকেট ছিলোনা।
মনের মধ্যে ধুকপুকানি, এই বুঝি ধরা পড়ি আর অপমানিত হই। আল্লাহ্র নাম নিতে নিতে এদিক সেদিক করে কোনোমতে বের হয়ে গেলাম স্টেশন থেকে। ঐদিকে শাকিলের অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে সারা রাতে। এবার আবার শৌচাগার খোঁজা শুরু হলো। খুঁজতে খুঁজতে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের সামনে যেয়ে দাঁড়ালাম। অবস্থা বেগতিক দেখে রাজু শাকিলকে নিয়ে মহিলা কলেজের শৌচাগারেই গেলো! আমরাতো হাসতে হাসতে পেট চেপে ধরেছি। সে এক অভিজ্ঞতাই বটে! যাক, ভালোই ভালোই এসব ঝামেলা শেষ করে চকবাজার মোড়ে এক রেস্তোরায় বসে সকালের নাশতাটা সেরে নিলাম। চকবাজার থেকে রওনা দিলাম পতেঙ্গার দিকে। হালিশহর হয়ে পতেঙ্গা পৌঁছলাম। এই প্রথম পা রাখলাম কোনো সমুদ্র শহরে।
পতেঙ্গার কথা:
নেমেই শাকিলের আবার শৌচাগার খোঁজা শুরু! পতেঙ্গা সমুদ্র পাড়ে একটা গণশৌচাগার পেলাম। ওহ! ভেতরের কী ছিরি! বমির উদ্রেকেই বেশি হলো পেটের চাপের চেয়ে। যাই হউক, কাজ সেরে হাত-মুখ ধুয়ে দৌড়ালাম সমুদ্র পাড়ে। সমুদ্র পাড়ে যেয়ে আবারও এক হতাশা চেপে ধরলো। দেখি রাস্তার ধার পর্যন্ত পানি, কোনো সৈকত নেই। প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে যখন পেছনে ফিরে আসছি, তখন স্থানীয় এক লোক বললো যে বিকেলের শুরুর দিকে ভাটা পড়তে শুরু করবে, আর তখন সৈকত ভেসে উঠবে। শুনে কিছুটা আশ্বস্ত হলাম। সমুদ্র দেখতে এসে যদি সৈকতেই না নামতে পারলাম তাহলে আর সমুদ্র বিলাসের পূর্ণতা পেলো কই!
এদিকে কারও ফোনেই চার্জ নেই। একটা দোকানে যেয়ে অনুরোধ করাতে দোকানদার তাঁর দোকানে আমাদের ফোন চার্জ দেয়ার অনুমতি দিলো। পালা করে সবার ফোনই অল্প অল্প চার্জ দিলাম, সাথে আমার ক্যামেরা খানিও। এর মধ্যেই দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। পাড়েই এক রেস্তোরায় যেয়ে বসলাম। সেখানে খাবার নিয়ে এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। আমাদের বসিয়ে রেখেই মুরগির স্পেশাল একটা ডিশ রান্না করে দিলো। বেশ ভালোই ছিলো খাবারটা। সাথে ডাল ফ্রি। খেয়ে দেয়ে সতেজ হয়ে এবার পাড়ের যে পর্যন্ত পানি ছিলো সেখানে গিয়ে একটা গাছের ছায়ায় বসলাম সবাই। এক ডাবওয়ালার কাছ থেকে ডাব নিলাম সবাই। এত বিশাল ডাব এর আগে কখনও খাইনি। খেয়ে পেট একদম টইটুম্বুর। শরীরে ঝিমুনি নিয়ে বসে রইলাম কখন ভাটা আসবে।
বিকেলের শুরুতে ভাটা পড়তে শুরু করলো, দেখতে দেখতে পাড় ভেসে উঠলো। মন খুশিতে একটু উত্তেজিত হয়ে উঠেছে, দৌড়ে নামলাম সৈকতে, আহ! সমুদ্র সৈকত! মাইলের পর মাইল জুড়ে বালুকা বেলা। এ এক অপূর্ব দৃশ্য, চোখে শান্তি নেমে আসলো। শুরু করলাম দৌড়ঝাপ। এর মধ্যেই হুট করে বৃষ্টির হানা। আশ্রয় নিলাম পাড়ে শোপিস বিক্রি করে এমন এক দোকানে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থেমে গিয়ে রোদের হাসিমুখ। আবার নামলাম সমুদ্র পাড়ে। তুহিন আর রাজুর সে কি উত্তেজনা।
উত্তেজনায় ওরা দুইজন সমুদ্রে নেমে গেলো। তুহিনের লুঙ্গি মাথায় উঠে এলো পানির নিচে। রিহান মডেলিং ভাব নিয়ে সমুদ্রে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা শুরু করলো। আমি, শাকিল আর আরাফাত একটু এলোমেলো ভাব নিয়ে সেলফি আর ছবি উঠাতে শুরু করলাম। মানে তখন আমাদের মনে আসলে কী যে কাজ করছিলো উত্তেজনায় আমরা নিজেরাও সচেতন ছিলাম না। এক অমোঘ মায়ায় পড়ে ছিলাম। ঐদিন ২৭ অগাস্ট ছিল, আমাদের বন্ধু শাবরিয়ারের জন্মদিন। আরাফাত বললো, চল ওরে উইশ করি।
আমরা বালিতে হ্যাপি বার্থডে লিখে তাকে উইশ করলাম। সমুদ্র পাড়ে নাচলাম, দৌড়ালাম, গাইলাম, হাঁটতে হাঁটতে সৈকতের অনেক গভীরে সরে গেলাম। একটা পাশ বরাবর আবার বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ঘাটি আছে, কিছুক্ষণ পরপরই বাংলার আকাশ রাখিবো মুক্ত স্লোগানে একটা দুইটা যুদ্ধবিমান আকাশে উড়াল দেয় টহল দেয়ার জন্য। এদিক সেদিক করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এলো! আবার জোয়ার শুরু হলো, সৈকত ডুবতে শুরু করলো। মাঝ সমুদ্রে নোঙর করা জাহাজে বাতি জ্বলে উঠলো, দখিনা বাতাসে গায়ে কাঁপন ধরলো, মন গেয়ে ওঠলো, “ওরে নীল দরিয়া, আমায় দে রে দে ছাড়িয়া”। পাড়ে রাখা পাথরে উঠে এসে বসলাম।
সমুদ্র থেকে আসা বাতাসে এমন এক অপার্থিব ভালো লাগা কাজ করছিলো যে আর উঠতে মন চাইছিলো না। তাও ঘন্টাখানেক বসে উঠে পড়তে বাধ্য হলাম, ঢাকায়তো ফিরতে হবে! রাতে চলে এলাম চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে। টিকেটের জন্য যেয়ে দেখি টিকেট আছে আসন নেই। লোকাল ট্রেন। ঐটাতেই ছটা টিকেট নিয়ে নিলাম। ট্রেন ছাড়বে রাত একটায়। অপেক্ষা করতে লাগলাম আমরা। বাড়ি ফেরার অপেক্ষা।
শেষের কথা:
ফেরার সময় ট্রেনেও সে এক বিশাল গল্প। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙ্গে আসছে। এই গল্প আরেকদিন করবো ইনশাআল্লাহ। আমরা বরং এবার বাড়ি ফিরে যাই। আমি নরসিংদীতে আমার বোনের বাসায় নেমে গেলাম সকালে, বন্ধুরা সব ঢাকায় চলে গেলো। আমাদের প্রথম ভ্রমণ কিছু না ভুলা স্মৃতি দিয়ে গেলো আমাদের।

2 Comments
অসম্ভব রোমাঞ্চকর ভ্রমন ছিল এটি। সর্বসাকুল্যে জন প্রতি খরচ হয়েছিল ৭২৬৳। ধন্যবাদ তোমাকে সুন্দর করে উপস্থাপন করার জন্য।
ReplyDeleteআমাদের প্রথম যাত্রা।
Delete