আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে আপনি কতক্ষণ
পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করে থাকতে পারবেন? আপনি হয়ত উত্তর দিবেন সর্বোচ্চ ২ মিনিট, কেউবা
আবার ৪ মিনিট। দুই মিনিটের পর থেকেই আপনার শরীর অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করতে থাকবে,
তিন মিনিটের পর মাথা হালকা হয়ে যাবে, মনে হবে হৃৎপিণ্ড কেউ টেনে ছিড়ে নিচ্ছে, আর যদি
৬ মিনিট পার হয়ে যায় তাহলে আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। স্বভাবিক কাজ করাতো অনেক দূরের ব্যাপার।
কিন্তু যদি বলি যে এমন এক সম্প্রদায়ই আছে যারা পানির নিচে সাধারণ ১৩ মিনিট পর্যন্ত
শ্বাস বন্ধ করে থেকে স্বাভাবিকভাবে কাজও করতে পারে, অবাক হবেননা? অবাক হওয়ারই কথা।
এমন এক সম্প্রদায়ই হচ্ছে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাগরের কূলে বাস করা বাজাউ সম্প্রদায় (Sama-Badjao) । এরা পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করে পানির ২০০ ফিট গভীর পর্যন্ত
চলে যেতে পারে এবং সেখানে গিয়ে মাছ ধরা, ঝিনুক কুড়ানো এবং অন্যান্য কাজও করতে পারে।
এদের প্রধান কাজ হচ্ছে বর্শা দিয়ে মাছ ধরা ও ঝিনুক কুড়ানো। এই দিয়েই এরা জীবিকা নির্বাহ
করে থাকে। ২০০ ফিট গভীরতা আমরা এভাবে কল্পনা করতে পারি যে আমাদের দেশের ২০ তলা দালানের
সমান। অবাক করা ব্যাপার না?
অস্বাভাবিক
শারীরিক সক্ষমতার কারণ:
![]() |
| একজন বাজাউ লোকের পানির নিচে মাছ ধরার ছবি। |
পরিচয়,
বাসস্থান, ও জীবনধারা:
![]() |
| স্টিল্ট-হাউজ (By I, Hu9423, CC BY-SA 2.5, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=2328937) |
![]() |
| লেপা-লেপা বোটহাউজ (By David P. Barrows - A History of the Philippines (1905), Public Domain, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=68866645) |
ব্যুৎপত্তি
ও ইতিহাস:
প্রচলিত আছে যে সামা-বাজাউরা একসময় স্থলেই
বসবাস করত। একবার তাদের রাজার মেয়ে সামুদ্রিক ঝড়ে হারিয়ে যায় বা কেউ ধরে নিয়ে যায়।
তাদের ওপর দায়িত্ব পড়ে রাজার মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে, তারা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয় এবং রাজার
শাস্তির ভয়ে আর রাজ্যে ফিরে না গিয়ে সমুদ্র উপকূলে বসবাস করতে শুরু করে।
![]() |
| স্টিল্ট-হাউজ |
তাছাড়াও ইন্দোনেশিয়ান সামা-বাজাউদের মধ্যে
আরেক ধরণের কাহিনী প্রচলিত আছে, যেখানে যোহর রাজ্যের চেয়ে গোয়া সালতানাতের সাথে তাদের
সম্পর্কের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে কোনো এক রাজকন্যা সমুদ্র ঝড়ে গোয়ায় ভেসে আসে এবং পরে সেখানের রাজার সাথে
তাঁর বিয়ে হয়। তাঁরা বরং তাদেরকে সেই রাজার বংশধর বলে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।
তাছাড়াও লোকমুখে আরও অনেক গল্প ঘুরে-ফিরে
বেড়ায়। যদিও তার সত্য-মিথ্যার ঠিক নেই। তবে আধুনিক গবেষণায় এসব লোকমুখে শ্রুত গল্পকে
উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে যেসব সাম্রাজ্যের কথা লোকমুখে প্রচলিত
সেগুলোর সৃষ্টি হয়েছে ১৩ শতকের পরে। কিন্তু বাজাউদের ইতিহাস আরও আগের। ১৯৬৫ সালের এক
গবেষণায় নৃতত্ববিদ ডেভিড ই সফার বলেন যে বাজাউ
এবং উড়াং লোত’দের পূর্বপুরুষ হচ্ছে ভেড্ডোর
জাতি, যারা দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান অত্যন্ত প্রাচীন এক জাতিগোষ্টির
মিশ্রণ। ১৯৬৮ সালের আরেক গবেষণায় নৃতত্ববিদ আর্লো নিমো বলেন বাজাউদের সাথে উড়াং লোতদের
কোনো সম্পর্ক নেই, বরং তাঁরা সোলাসেও, বোর্নেওর আদি জাতিগোষ্ঠি।
তবে সর্বশেষ ১৯৮৫ সালের এক গবেষনায় ভাষাগত
মিল থেকে নৃতত্ববিদ আলফ্রেড কেম্প পলসেন বলেন যে সামা-বাজাউরা বরং প্রোটো-সামা-বাজাউদের
সাথে সম্পর্কিত যারা ফিলিপিনের যাম্বোয়াঙ্গা
পেনিনসুলাতে বাস করতো এবং তাদের উৎপত্তি অষ্টম শতকে। আধুনিক সময়ে এটাকেই সবচে গ্রহণযোগ্য
মতামত বলে ধরা হয়।
![]() |
| লেপা ফেস্টিভাল (By Photo by CEphoto, Uwe Aranas or alternatively © CEphoto, Uwe Aranas, CC BY-SA 3.0, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=42363224) |
শেষ করা যাক শেষের কিছু কথা দিয়ে। বাজাউড়া
প্রায় দশটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে থাকে, তবে সবচে বেশি ব্যবহৃত ভাষাটি হচ্ছে মালায়ো-পলিনেশিয়ান ভাষা। তাঁরা ধর্মের দিক
দিয়ে সিংহভাগই সুন্নি মুসলিম, বাকিরা সুফিবাদ ও খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী। বিচিত্র তাদের
জীবনধারা, বিচিত্র তাদের ইতিহাস। সমুদ্রেই যাদের ঘরবাড়ি, সমুদ্রই যাদের সব। হৃদয়টাও
বেড়ে উঠে সমুদ্রের মত। সময়-সুযোগ পেলে একবার বাজাউদের রাজ্য থেকে ঘুরে আসতে পারেন।
কি, যাবেন নাকি?







0 Comments