বাজাউ সম্প্রদায়: দ্য রিয়েল লাইফ অ্যাকুয়াম্যান।

 

আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় যে আপনি কতক্ষণ পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করে থাকতে পারবেন? আপনি হয়ত উত্তর দিবেন সর্বোচ্চ ২ মিনিট, কেউবা আবার ৪ মিনিট। দুই মিনিটের পর থেকেই আপনার শরীর অক্সিজেনের জন্য হাহাকার করতে থাকবে, তিন মিনিটের পর মাথা হালকা হয়ে যাবে, মনে হবে হৃৎপিণ্ড কেউ টেনে ছিড়ে নিচ্ছে, আর যদি ৬ মিনিট পার হয়ে যায় তাহলে আপনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন। স্বভাবিক কাজ করাতো অনেক দূরের ব্যাপার। কিন্তু যদি বলি যে এমন এক সম্প্রদায়ই আছে যারা পানির নিচে সাধারণ ১৩ মিনিট পর্যন্ত শ্বাস বন্ধ করে থেকে স্বাভাবিকভাবে কাজও করতে পারে, অবাক হবেননা? অবাক হওয়ারই কথা। এমন এক সম্প্রদায়ই হচ্ছে দক্ষিন-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের সাগরের কূলে বাস করা বাজাউ সম্প্রদায় (Sama-Badjao) । এরা পানির নিচে শ্বাস বন্ধ করে পানির ২০০ ফিট গভীর পর্যন্ত চলে যেতে পারে এবং সেখানে গিয়ে মাছ ধরা, ঝিনুক কুড়ানো এবং অন্যান্য কাজও করতে পারে। এদের প্রধান কাজ হচ্ছে বর্শা দিয়ে মাছ ধরা ও ঝিনুক কুড়ানো। এই দিয়েই এরা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। ২০০ ফিট গভীরতা আমরা এভাবে কল্পনা করতে পারি যে আমাদের দেশের ২০ তলা দালানের সমান। অবাক করা ব্যাপার না?

 

অস্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতার কারণ:  

একজন বাজাউ লোকের পানির নিচে মাছ ধরার ছবি।
তাদের এমন অস্বাভাবিক শারীরিক সক্ষমতার কারণ কী? এক গবেষণায় দেখা গেছে যে জেনেটিক মিউটেশনের ফলে বাজাউ সম্প্রদায়ের লোকেদের প্লিহার আকৃতি সাধারণ মানুষের প্লিহার চেয়ে দেড় গুণ বড় হয়ে থাকে। প্লিহা শরীরে রক্তের ছাঁকুনি হিসেবে কাজ করে,  শরীরের দূষিত এবং ক্ষয়প্রাপ্ত লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে শরীর থেকে বের করে দেয় এবং বিশুদ্ধ রক্ত ও আয়রন শরীরে প্রবেশ করাতে সাহায্য করে এবং রোগ প্রতিরোধ অঙ্গ হিসেবে কাজ করে। প্লিহা প্রাথমিকভাবে অক্সিজেনের যোগানদাতা না হলেও, যখন প্রচণ্ড অক্সিজেনের অভাবে হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে যায়, তখন চাপে পড়ে প্লিহাও সংকুচিত হয় এবং অক্সিজেন সম্বলিত লোহিত রক্তকণিকার অবমুক্তি ঘটায়, আর তাতে করেই তৎক্ষণাৎ শরীরের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের ঘাটতি পূরণ করে। তাছাড়াও এদের শরীরে আরও পঁচিশটি স্বতন্ত্র জ্বীন রয়েছে যেগুলো ওদের জলীয় পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে সাহায্য করে। এমন অস্বভাবাবিক শারীরিক সক্ষমতার অধিকারী যাঁরা তাদের জীবনধারা সম্পর্কে আরেকটু জেনে আসা যাক চলুন।

 

পরিচয়, বাসস্থান, ও জীবনধারা:

স্টিল্ট-হাউজ (By I, Hu9423, CC BY-SA 2.5,
https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=2328937)
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপিনের তায়োতায়ো দ্বীপ, মিন্দানাওয়ের উপকূলীয় অঞ্চল, ইন্দোনেশিয়ার বোর্নেও, সোলাওসি, এবং পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ, মালেশিয়ার সাবাহ রাজ্যের উপকূল এবং এতদ্বঞ্চলের সাথে ব্রুনাইয়ের উপকূলে এদের বসবাস। সব জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাজাউ সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা প্রায় এগারো লক্ষ। এদেরকে “সাগরের জিপসি” বা “সাগরের যাযাবরও” বলা হয়ে থাকে, অনেকটা আমাদের দেশের বেদে সম্প্রদায়ের মত। একেক জায়গার বাজাউরা নিজেদেরকে একেক নামে পরিচয় দিয়ে থাকে। সাধারণত নিজেদেরকে তারা বাজাউ বলে না। তবে “বাজাউ” বলতে সাধারণত সমুদ্রের সাথে জীবন জড়িত এমন অবস্থাকে বুঝায়। ফিলিপিনে ওঁরা নিজেদেরকে সামা দিলোত বা সামা মানদিলোত বলে থাকে। আবার মালেশিয়াতে তাঁরা নিজেদেরকে বাজাউ লত, মালায় বলে থাকে। অস্ট্রোনেশিয়ান শব্দ সামা’র পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে একসাথে, এক বা আত্মীয়। সমুদ্র অঞ্চলে দল বেঁধে থাকে বলে ওঁরা সামা বাজাউ নামে পরিচিত।  বৃটিশ কলোনিয়াল সময়ে বৃটিশ প্রশাসন তাদেরকে অফিশিয়ালি বাজাউ নাম দেয়। বাজাউরা একধরণের বোটহাউজে বসবাস ও চলাচল করে থাকে যেটিকে তাঁরা লেপা, লিপা বা লেপা-লেপা বলে থাকে। তাছাড়াও তাঁরা তাদের থাকার জন্য ভূমি ও ভূমির পাশের সমদ্রপৃষ্ঠ মিলিয়ে এক ধরণের ঘর বানায় যেটাকে স্টিল্ট-হাউজ বা রণপা ঘর বলা হয়ে থাকে। সমুদ্রে মাছ ধরে এবং বেচে এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক বাণিজ্য করেই সাধারণত তাঁরা জীবিকা ধারণ করে থাকে। তাঁরা আধুনিক জীবন ধারণে তেমন আগ্রহীও না, পড়াশোনা থেকেও তাঁরা বেশ দূরে। বলা যায় একেবারেই যাযাবরিক এক জীবনের সাথে তাঁরা অভ্যস্ত। তবে জাতি হিসেবে তাঁরা একেবারেই শান্ত, নিরীহ, শান্তিপ্রিয় এবং অতিথিপরায়ণ। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা সমুদ্রের সাথে এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলে। তবে মাছ বাণিজ্যের জন্য তাদেরকে সভ্য জগতের সাথেও চলাচল করতে হয়।
লেপা-লেপা বোটহাউজ (By David P. Barrows - A History of the Philippines (1905), Public Domain, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=68866645)

 

ব্যুৎপত্তি ও ইতিহাস:

প্রচলিত আছে যে সামা-বাজাউরা একসময় স্থলেই বসবাস করত। একবার তাদের রাজার মেয়ে সামুদ্রিক ঝড়ে হারিয়ে যায় বা কেউ ধরে নিয়ে যায়। তাদের ওপর দায়িত্ব পড়ে রাজার মেয়েকে ফিরিয়ে আনতে, তারা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয় এবং রাজার শাস্তির ভয়ে আর রাজ্যে ফিরে না গিয়ে সমুদ্র উপকূলে বসবাস করতে শুরু করে।

স্টিল্ট-হাউজ
বোর্নেওতে বসবাসরত বাজাউদের মধ্যে আরেকটা কাহিনী প্রচলিত আছে যে, তাঁদের পুর্বপূরুষরা ছিলো মালেশিয়ার যোহর রাজ্যের রাজকীয় বাহিনীর সদস্য। একবার তাঁরা তাঁদের দেশের রাজকন্যা দায়েং আয়শাকে সমুদ্রপথে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলো, যাঁর বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো সুলু রাজ্যের রাজার সাথে। সেই রাজকন্যাকে আবার পছন্দ করত ব্রুনাইয়ের সুলতান মুহাম্মদ শাহ। মাঝসমুদ্রে ব্রুনাইয়ের সুলতানের বাহিনী অতর্কিত আক্রমণ করে রাজকন্যাকে ছিনিয়ে নেয় এবং ব্রুনাইয়ের সুলতানের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। পরে তাঁরা আর তাদের রাজ্যে ফিরে না গিয়ে বোর্নেও এবং সুলু উপকূলে বসবাস শুরু করে।

তাছাড়াও ইন্দোনেশিয়ান সামা-বাজাউদের মধ্যে আরেক ধরণের কাহিনী প্রচলিত আছে, যেখানে যোহর রাজ্যের চেয়ে গোয়া সালতানাতের সাথে তাদের সম্পর্কের গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়ে থাকে যে কোনো এক রাজকন্যা সমুদ্র ঝড়ে গোয়ায় ভেসে আসে এবং পরে সেখানের রাজার সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁরা বরং তাদেরকে সেই রাজার বংশধর বলে পরিচয় দিতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে।

তাছাড়াও লোকমুখে আরও অনেক গল্প ঘুরে-ফিরে বেড়ায়। যদিও তার সত্য-মিথ্যার ঠিক নেই। তবে আধুনিক গবেষণায় এসব লোকমুখে শ্রুত গল্পকে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে যেসব সাম্রাজ্যের কথা লোকমুখে প্রচলিত সেগুলোর সৃষ্টি হয়েছে ১৩ শতকের পরে। কিন্তু বাজাউদের ইতিহাস আরও আগের। ১৯৬৫ সালের এক গবেষণায় নৃতত্ববিদ ডেভিড ই সফার বলেন যে বাজাউ এবং উড়াং লোত’দের পূর্বপুরুষ হচ্ছে ভেড্ডোর জাতি, যারা দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ান অত্যন্ত প্রাচীন এক জাতিগোষ্টির মিশ্রণ। ১৯৬৮ সালের আরেক গবেষণায় নৃতত্ববিদ আর্লো নিমো বলেন বাজাউদের সাথে উড়াং লোতদের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং তাঁরা সোলাসেও, বোর্নেওর আদি জাতিগোষ্ঠি।

তবে সর্বশেষ ১৯৮৫ সালের এক গবেষনায় ভাষাগত মিল থেকে নৃতত্ববিদ আলফ্রেড কেম্প পলসেন বলেন যে সামা-বাজাউরা বরং প্রোটো-সামা-বাজাউদের সাথে সম্পর্কিত যারা ফিলিপিনের যাম্বোয়াঙ্গা পেনিনসুলাতে বাস করতো এবং তাদের উৎপত্তি অষ্টম শতকে। আধুনিক সময়ে এটাকেই সবচে গ্রহণযোগ্য মতামত বলে ধরা হয়।

লেপা ফেস্টিভাল (By Photo by CEphoto, Uwe Aranas or alternatively © CEphoto, Uwe Aranas, CC BY-SA 3.0, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=42363224)
 


শেষ করা যাক শেষের কিছু কথা দিয়ে। বাজাউড়া প্রায় দশটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলে থাকে, তবে সবচে বেশি ব্যবহৃত ভাষাটি হচ্ছে মালায়ো-পলিনেশিয়ান ভাষা। তাঁরা ধর্মের দিক দিয়ে সিংহভাগই সুন্নি মুসলিম, বাকিরা সুফিবাদ ও খৃষ্টান ধর্মের অনুসারী। বিচিত্র তাদের জীবনধারা, বিচিত্র তাদের ইতিহাস। সমুদ্রেই যাদের ঘরবাড়ি, সমুদ্রই যাদের সব। হৃদয়টাও বেড়ে উঠে সমুদ্রের মত। সময়-সুযোগ পেলে একবার বাজাউদের রাজ্য থেকে ঘুরে আসতে পারেন। কি, যাবেন নাকি?


An-Nur Mosque, the main mosque in the Bajau village of Tuaran, Sabah, Malaysia, (By Photo by CEphoto, Uwe Aranas or alternatively © CEphoto, Uwe Aranas, CC BY-SA 3.0, https://commons.wikimedia.org/w/index.php?curid=22397572)

Post a Comment

0 Comments