আমাদের পরিচিত পৃথিবীটা, অর্থাৎ আমরা যেই গ্রহে বাস করি সেটা কত বড়? সংখ্যার বিচারে পরে আসি, চোখের দৃষ্টিসীমার বিচারে সেটা অনেক বড়ই বটে। আমরা যখন বড় বড় আয়তনের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকাই, ভাবী দেশটা কত বড়। সমগ্র পৃথিবীর সব দেশের কথা একসাথে চিন্তা করলে বিশাল একটা আয়তন আমাদের মানসপটে ভেসে উঠে। আসলেই কিন্তু তাই। সংখ্যার বিচারে আমাদের পৃথিবীটা নেহায়েত ছোট নয়। কত সে সংখ্যাটা? একটু হিসেব করা যাক।
পৃথিবীর কতবড় সেটার ধারণা
পৃথিবীর ব্যাসার্ধ ৩,৯৫৯ মাইল (৬,৩৭১ কিলোমিটার) । সে হিসেবে পৃথিবীর পরিধি প্রায় ২৫ হাজার মাইল (২*৩.১৪১৬*৩৯৫৯) বা ৪০,০৩০ কিলোমিটার। ধরুন, আপনি সমগ্র পৃথিবীটাকে সূতা দিয়ে একবার প্যাচাতে চান। তাহলে আপনার ২৫ হাজার মাইল বা ৪০ হাজার কিলোমিটার লম্বা সূতার প্রয়োজন। আয়তনে পৃথিবী প্রায় ৫১ কোটি বর্গ কিলোমিটার।
এবার একটু কল্পনা করার চেষ্টা করি পৃথিবী কতটা বিশাল একটা জায়গা। তাইনা? যখন আমরা উঁচু পাহাড়-পর্বতের দিকে তাকাই, যখন সমুদ্র পানে তাকাই তখন হয়ত কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায় এই পৃথিবীর বিশালত্ব। এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক।
সৌরজগতের সাথে পৃথিবীর আয়তনের তুলনা
আমাদের প্রিয় পৃথিবী নামক গ্রহটি সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। সুর্যকে কেন্দ্র করে আমাদের পৃথিবী ছাড়াও আরো ৭টি, অর্থাৎ মোট ৮ টি গ্রহ ঘুরছে। সেগুলি হচ্ছে মার্কারি, ভেনাস, আর্থ(পৃথিবী), মার্স, জুপিটার, স্যাটার্ন, ইউরেনাস, এবং নেপচুন। তাছাড়াও প্লুটোর মত ছোট গ্রহ ছাড়াও রয়েছে অনেক গ্রহাণু(Asteroids), ধূমকেতু(Comets), উল্কা(Meteoroids)।
রয়েছে আমাদের চাঁদের মত আরো প্রায় ১৫০টি চাঁদ। সূর্যকেন্দ্রিক ঘূর্ণায়মান সকল বস্তু নিয়ে সূর্যের আশেপাশে যেই জগত গড়ে উঠেছে সেটাকে আমাদের সূর্যের সৌরজগৎ (Solar System) বলে (একেকটা গ্যালাক্সিতে অসংখ্য Solar System রয়েছে)। আয়তনের দিক দিয়ে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে, এমন গ্রহসমুহের মধ্যে আমাদের পৃথবীর অবস্থান পঞ্চম। সবচে বড় গ্রহ বৃহস্পতি (জুপিটার) আমাদের পৃথিবীর চেয়েও প্রায় ১২০ গুণ বড়।
গ্যালাক্সির আয়তন ও পৃথিবী
এইযে সুর্যকে কেন্দ্র করে এত ঘুরাঘুরি ও আলোচনা চলছে, সেই সূর্যটা আমাদের পৃথবীর চেয়ে কত বড় জানেন? ১৩ লক্ষ গুণ। একটু ভাবুনতো, আমাদের বিশাল পৃথিবীর মত এমন ১৩ লক্ষ পৃথিবীকে সূর্যের বুকে ঠাই দেওয়া যাবে। সুর্যের বিশালত্ব বুঝা যাচ্ছে? সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে ৮ মিনিট ২০ সেকেন্ড। এই আলো আবার প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল বা ৩ লক্ষ কিলোমিটার গতিতে ছোটে।
আলো এক সেকেন্ডে যতটুকু যায় তাকে এক আলোক সেকেন্ড, ১ মিনিটে যতটুকু যায় তাকে এক আলোক মিনিট, এভাবে এক বছরে আলো যত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে তাকে এক আলোকবর্ষ বলে। সুর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসার সময়ের হিসেব ধরে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব প্রায় ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল বা ১৫ কোটি কিলোমিটার। একটি প্লেন বা রকেট যদি পৃথিবী থেকে সূর্যের দিকে ছোটানো হয় আর সেটি যদি অনবরত ৬৪৪ কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে চলতে থাকে, তাহলে সেটা সূর্যে যেয়ে পৌঁছোতে ২০ বছর সময় লাগবে।
এটা শুধু সূর্য আর পৃথিবীর মধ্যকার ফাঁকা জায়গার হিসেব। তাহলে সৌরজগতে সূর্য এবং এত গ্রহ সহ আরো অন্যান্য মহাজাগতিক বস্তুগুলি যে জায়গা দখল করে আছে, এবং দখলকৃত জায়গা ছাড়াও প্রতিটা থেকে প্রতিটার দূরত্বের কারণে যেই ফাঁকা জায়গা রয়েছে সে জায়গাটা কত বিস্তৃত কল্পনা করতে পারছেন পাঠক? সৌরজগতের সবচে দূরবর্তী বস্তুটির নাম হচ্ছে সেডনা, যেটির দূরত্ব সূর্য থেকে ১৪৩.৭৩ বিলিয়ন কিলোমিটার। সে হিসেবে এর বিপরীতেও সৌরজগতের সমদূরত্বের জায়গা রয়েছে ধরে নেওয়া যায়, তাতে করে সমগ্র সৌরজগতের ব্যাস দাঁড়ায় প্রায় ২৮৭.৪৬ বিলিয়ন কিলোমিটার। সংখ্যাটি লিখতে গেলে ১ এর পর অনেকগুলি শূন্য দিতে হবে, যা মানুষের মস্তিষ্ক সহজে নিতে পারবে না।
চলুন একটু সহজ হিসেব করা যাক। নাসার বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক দূরত্বের বড় বড় হিসেব রাখার জন্য অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল ইউনিট (Astronomical Unit- AU) নামক একটি একক নির্ধারণ করেছে। ১ এ ইউ = ৯৩ মিলিয়ন মাইল বা ১৫০ মিলিয়ন কিলোমিটার (৯.৩ কোটি মাইল বা ১৫ কোটি কিলোমিটার যেটি পৃথিবী থেকে সুর্যের দূরত্বের সমান, এবং পৃথিবী থেকে সূর্যের দুরত্বকে একক ধরেই এই এই পরিমাপক নির্ধারণ করা হয়েছে)। সেটির হিসেবে আমাদের সৌরজগতের ব্যাস দাঁড়ায় ১৯২১ এ ইউ (AU)। একটু চিন্তা করুন, সংখ্যার বড়ত্বের বিচারে এই সংখ্যাটি কত বড়।
এতক্ষণ আমরা যা নিয়ে কথা বললাম, তা ছিলো শুধু আমাদের সৌরজগতের বিশালত্ব সম্পর্কে। বিজ্ঞানীরা সৌরজগতের বিস্তৃতির সবটাই জেনে ফেলেছে সেটাও বলা যাচ্ছে না, বরং এর উল্টোটাই সঠিক। এখন যা বলব সেটি শোনার জন্য খুব শক্ত হয়ে বসুন। আমাদের সৌরজগৎ মিল্কি ওয়ে (Milky Way) নামক গ্যালাক্সির সদস্য, এবং পুরো মিল্কি ওয়ের আকারের তুলনায় আমাদের সৌরজগতের আকার অতি নগণ্য। যদি মিল্কি ওয়েকে পৃথিবীর সব বালু কণার সমষ্টি ধরা হয়, তবে সেখানে আমাদের পুরো সৌরজগতের আয়তন একটি অতিক্ষুদ্র বালু কণার মতই হবে, বা এরচেয়েও ছোট। তাহলে আমাদের প্রিয় পৃথিবী নামক গ্রহের অবস্থান কোথায় চিন্তা করতে পারছেন?
বর্তমান সময়ের সবচে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপ (Hubble Space Telescope) নামক এক শক্তিশালী টেলিস্কোপ বানিয়েছে, যার মাধ্যমে তাঁরা মহাশূন্যের এক মহা বিস্তৃত অঞ্চলের মধ্যে অনুসন্ধান এবং পর্যবেক্ষণ চালাতে সক্ষম হয়েছে। সেই পর্যবেক্ষণক্ষম সীমানাও ১৩ হাজার মিলিয়ন আলোকবর্ষের (১৩০০ কোটি) বেশি নয়। এই ১৩০০ কোটি আলোকবর্ষ সীমানার মধ্যে প্রায় ১০০ কোটি গ্যালাক্সির সন্ধ্যান পাওয়া গেছে।
প্রতিটি গ্যালাক্সি আবার গড়ে ১ লক্ষ আলোকবর্ষ ব্যাপী জায়গা নিয়ে মহাশূন্যে বিস্তৃত। এক একটা গ্যালাক্সি মানেই অসংখ্য নক্ষত্র। এইযে ১৩০০ কোটি আলোকবর্ষ বিস্তৃত সীমানার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা বিজ্ঞানীরা পেয়েছে, সেটিও ধারণাকৃত মহাবিশ্বের আকারের তুলনায় ৫-৬ ভাগ মাত্র। বিজ্ঞানীদের ধারণা মতে আমাদের মহাবিশ্বের বিস্তৃতি প্রায় ২০,০০০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। সমগ্র মহাশূন্য জুড়ে জায়গায় জায়গায় পুঞ্জীভূত হয়ে রয়েছে অসংখ্য গ্যালাক্সি, সেই পুঞ্জকে গ্যালাক্সিপুঞ্জ বলে। মহাশূন্য জুড়ে রয়েছে এমন অসংখ্য গ্যালাক্সিপুঞ্জ। সেসব গ্যালাক্সিপুঞ্জতে একেকটা গ্যালাক্সির আকার সেই পুঞ্জের তুলনায় অতি নগণ্য।
তারপরেও, আবিষ্কৃত ১০০ কোটি গ্যালাক্সি কতটা জায়গা জুড়ে বিস্তৃত, সেটা কি আমরা ধারণা করতে পারি? এত বিশালতায় যেখানে আমাদের এত বিশাল গ্যালাক্সির অবস্থানও এতই নগণ্য যে মহাশূন্যে যদি সেটি হারিয়েও যায় তাহলেও পুরো মহাশূন্যের কোথাও কোনো অঞ্চলে তার প্রভাব পড়বে না। সেখানে আমাদের সৌরজগৎ কতটা নগণ্য সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না, এবং আমরা মানুষতো অতি আণুবীক্ষণিক কণার চেয়েও নগণ্য, যার অস্তিত্ব থাকা না থাকায় কোথাও কিছু যায়-আসে না।
শেষ কথা: আমাদের অহঙ্কার যেখানে এসে ধূলিসাৎ হয়ে যায়
এত সামান্য অস্তিত্ব নিয়ে যেখানে আমরা আমাদের সৌরজগতের এক চাঁদ ছাড়া আর কোথাওই পা রাখতে পারলাম না, সেখানে সমগ্র মহাবিশ্ব দূরে থাক, পুরো সৌরজগতটা ঘুরে শেষ করাই যেখানে আমাদের ক্ষমতার বাইরে, আর সেই অতি নগণ্য মানুষই কি না সমগ্র মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা সেই মহান স্বত্বা আল্লাহকে না দেখতে পাবার অযুহাতে অস্বীকার করে বসি!
যেখানে সামান্য সৃষ্টিকে আমরা ধারণ করা দূরে থাক, চিন্তার জগতেই ঠাই দিতে পারি না, সেই সৃষ্টির স্রষ্টাকে কীভাবে আমরা এই ইহজাগতিক শরীর আর মন দিয়ে ধারণ করব? এত ক্ষুদ্র যেই মানুষ, তাদেরতো স্রষ্টাকে নিয়ে এমন ঔদ্ধত্য প্রকাশ করার কোনো কারণই থাকতে পারে না। মানুষ যদি আল্লাহকে নিয়ে এত বিচলিত না হয়ে সেই মহান স্বত্বার সৃষ্টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতো, তাহলে আল্লাহ্ সম্পর্কে এমন দুঃসাহসিক অজ্ঞতা এবং অহংকার দেখানো কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভবপর ছিলো না।
উদাহরণ দেওয়া যাক; ধরুন সাগরের গভীরে কত কত ক্ষুদ্র প্রাণি থেকে শুরু করে কত বিশাল জলজ প্রাণির বাস, একই সাথে সেই সমদ্রের গভীরেই চলে মানুষের তৈরি সাবমেরিন। কিন্তু কখনো কি সমদ্রের সেই প্রাণিকূল সেই সাবমেরিন সম্পর্কে ধারণা করতে পারে? তাদেরকে কি সেই জ্ঞান দেওয়া হয়েছে? আমরা শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে অতিক্ষুদ্র অনু-পরমাণু-জীবাণু পর্যবেক্ষণ করতে পারি, কিন্তু সেইসব অনু-পরমাণু-জীবাণুর কি কখনো কোনো ধারণা হবে মানুষ সম্পর্কে?
তাই বলে আপনি কি কখনো এইসব জীবাণুকে অস্বীকার করতে পারবেন? অথবা এইসব জীবাণুর দৃষ্টিকোন থেকে আপনার নিজেকেই অস্বীকার করতে পারবেন? এইসব জীবাণুরতো মানুষ সম্পর্কে কোনো জ্ঞানই নেই, তাই বলে কি আমরা মানুষরা মিথ্যা। নিশ্চয় তা নয়। মানুষ সম্পর্কিত জ্ঞান দিয়ে তাদের কোনো কল্যাণ নেই, তাই তাদেরকে আল্লাহ্ সেই জ্ঞান দেননি। আমরাও আল্লাহকে দেখতে পাইনা বলে সেই মহান ও চিরঞ্জীব সত্বাকে অস্বীকার করে বসে থাকব, এই অধিকারইতো আমাদের নেই। তবু কী করে আমরা মহাবিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহকে অবিশ্বাস করি?
অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী(সমগ্র মহাবিশ্ব) ওতপ্রোতভাবে মিশিয়া ছিলো, অতঃপর আমি উভয়কে (প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে) পৃথক করিয়া দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করেছি। তবুও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? _আল কুর’আন, সূরা আম্বিয়া, আয়াত- ৩০
নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের বিবর্তনে এবং নদীতে নৌ-যান সমূহের চলাচলে মানুষের জন্য কল্যাণ রয়েছে। আর আল্লাহ তা’আলা আকাশ থেকে যে পানি নাযিল করেছেন, তদ্বারা মৃত যমীনকে সজীব করে তুলেছেন এবং তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সবরকম জীব-জন্তু। আর আবহাওয়া পরিবর্তনে এবং মেঘমালার যা তাঁরই হুকুমের অধীনে আসমান ও যমীনের মাঝে বিচরণ করে, নিশ্চয়ই সে সমস্ত বিষয়ের মাঝে নিদর্শন রয়েছে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্যে। _আল কুর’আন, সূরা বাক্বারা, আয়াত- ১৬৪

0 Comments