আচ্ছা, শহরে কখনো ওয়াসার পানি সাপ্লাই বন্ধ হতে দেখেছেনতো? আগের দিন ঘোষণা
করে দেয় যে পরের দিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পানির সাপ্লাই থাকবে না। অথবা কোনো
পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই মাঝে মাঝে পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। তখন আপনারা কী করেন? আপনাদের
হাহুতাস আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়। কখনো একটানা দশদিন বা তারও বেশি পানির অভাবে পড়েছেন?
কলস, বড়ো পাতিল ইত্যাদি নিয়ে প্রতিদিনের পানি আনার জন্য মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন?
গাড়ি দিয়ে নয় কিন্তু, হেঁটে গিয়েছেন, দূর্গম রাস্তা দিয়ে? যাননি তো? ইন্টারনেটে How
many countries don’t have clean water লিখে সার্চ দেবেন। তারপর আপনার ভাগ্যের
সাথে তাঁদের ভাগ্য মেলাবেন। ভেবে দেখবেন তো, আপনি যদি সবসময় সিজদায় পড়ে থেকে আরশের
মালিকের শুকরিয়া আদায় করেন, তবু আপনাকে যে প্রতিদিন অঢেল বিশুদ্ধ পানি তিনি পান
করাচ্ছেন, সেটির শুকরিয়া আদায় করে শেষ করতে পারেন কিনা?
![]() |
আর আমি আকাশ থেকে পরিমিত পানি বর্ষণ করেছি। অতঃপর আমি তা জমিনে সংরক্ষণ করেছি। আর অবশ্যই আমি সেটাকে অপসারণ করেত সক্ষম। _সূরা আল-মুমিনুন:১৮।
বলো, “তোমরা ভেবে দেখেছো কি, যদি তোমাদের পানি ভূগর্ভে চলে যায়, তাহলে কে তোমাদেরকে বহমান পানি এনে দেবে? _সূরা আল-মূলক:৩০
তোমরা যে পানি পান করো সে ব্যাপারে আমাকে বল। বৃষ্টিভরা মেঘ থেকে তোমরা কি তা বর্ষণ কর, না আমি বৃষ্টি বর্ষণকারী? ইচ্ছে করলে আমি তা লবনাক্ত করে দিতে পারি; তবুও কেন তোমরা কৃতজ্ঞ হও না? _সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৬৮-৭০।
আমাদের তো খাবারও খেতে হয়। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন, খাবারের মাধ্যমেই
আমাদের বাঁচিয়ে রাখেন। যতো ধনীই আমরা হই, কেউ কি এমন আছে যে না খেয়ে বাঁচতে পারবে?
শত কোটির টাকার যে মালিক, সে কি টাকা খেয়ে বাঁচতে পারে? বা কখনো পারবে? কখনোই না।
সে খাবার আসে কোথ্যেকে? বলবেন মানুষ ক্ষেতে উৎপাদন করে? আচ্ছা আসলেই কি মানুষ
কোনকিছু উৎপাদন করার ক্ষমতা রাখে? কে আপনার জমিতে ফসল ফলায়? আপনি ভাবছেন আপনি সারা
বছর পরিশ্রম করে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে ক্ষেতে ফসল ফলান? আছে কারো সেই ক্ষমতা?
থাকলে একটা বীজ বানিয়ে দেখানতো?
তোমরা আমাকে বল, তোমরা জমিনে যা বপন কর সে ব্যাপারে। তোমরা তা অঙ্কুরিত কর, না আমি অঙ্কুরিত করি? আমি চাইলে তা খড়কুটোয় পরিণত করতে পারি, তখন তোমরা পরিতাপ করতে থাকবে। (এই বলে), ‘নিশ্চয় আমরা দায়গ্রস্ত হয়ে গেলাম’। _সূরা আল-ওয়াকিয়াহ: ৬৩-৬৬।
আবার দেখা যায় ফসল ফলার পর ঘরে তোলার অপেক্ষায় আছি। ঠিক তেমন সময় শিলাবৃষ্টি,
লু-হাওয়া ইত্যাদিতে ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এতো পরিশ্রমের পর প্রায় পাকা ফসলও আমরা ঘরে
তুলতে পারি না। এই তো কিছুদিন আগেই নেত্রকোনা, ময়মনসিংয়ের ঐদিকে এক লু-হাওয়া এসে
ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে দিয়ে গেল? কেউ কল্পনা করেছিলো, যে ঘরে তোলার অপেক্ষারত ফসল
এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে? এটাতেও কি আমাদের অক্ষমতা প্রকাশ পায় না? এটাও আমাদের না শুকরিয়ারই
ফল। আমরা এতো এতো নেয়ামত পেয়ে রবের শুকরিয়া আদায় করি না। তিনি এতো নিদর্শন আমাদের
চোখের সামনে দিয়ে রেখেছেন, আমরা তা চোখ মেলে দেখি না।
আর যদি এমন বাতাস প্রেরণ করি যার ফলে তাঁরা শস্যকে হলুদ রঙের দেখতে পায়? তখন তো তাঁরা অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়ে। -সূরা আর-রুম:৫১
রাব্বুল আলামিন চাইলেই আমাদের
অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারেন। এইযে জন্ম থেকে
বেশুমার অক্সিজেন গ্রহণ করেই যাচ্ছি, তাও সব বিনামূল্যে,
সেটার শুকরিয়া কি আমরা কখনও আদায় করেছি বা করি? আমার-আপনার এক ঘন্টার অক্সিজেনের দাম কতো হতে পারে দেখছেনতো? এতোদিনে বুঝে ফেলার কথা যে অক্সিজেন কতো দামি জিনিস।
বলতে গেলে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সবচে শীর্ষ সময়ে রয়েছি আমরা।
কিন্তু আজ পর্যন্ত এতো এতো বিজ্ঞানী মিলে এক নিশ্বাস অক্সিজেন বানাতে পেরেছে? বিজ্ঞানের
অবদান তাহলে কী? বিজ্ঞান শুধু এতটুকুই আবিষ্কার করতে পেরেছে
যে, আমরা বাঁচার জন্য অক্সিজেন গ্রহণ করি। বিজ্ঞান
অক্সিজেন বানাতে পারে না। এই যে সিলিন্ডারে করে অক্সিজেন সরবরাহ করছে, সেটা কিন্তু বিজ্ঞানের বানানো অক্সিজেন না। বিজ্ঞান শুধু বাতাসে
নাইট্রোজেনের সাথে মিশে থাকা অক্সিজেনকে আলাদা করে ব্যবহারোপযোগী করে তুলে। আমাদের
এক নিশ্বাস অক্সিজেন বানানোর ক্ষমতাও যে নেই সেটা আমরা বুঝতে পারছি তো? সামান্য কিছু মানুষের অক্সিজেন ঘাটতি দেখা দেওয়াতেই চিকিৎসায় এতো উন্নত
ভারতের পুরো মেডিক্যাল সিস্টেম কলাপস করেছে।
শুধু এক অক্সিজেনের জন্যই আল্লাহর কাছে কেয়ামত পর্যন্ত শুকরিয়া আদায়
করলেওতো আমাদের শুকরিয়া আদায় শেষ হবে না। কিন্তু আমরা কতোই না দর্প দেখিয়ে চলি!
আমরা যে প্রতিনিয়ত আল্লাহর দয়া আর রহমত দিয়ে পরিবেষ্টিত আছি, সেটা
আমরা ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝি না, যতক্ষণ না আরশের মালিক সেই
নেয়ামতরাজি থেকে কিছু একটা আমাদের বুঝার জন্য কমিয়ে দেন। তারপরও আমরা শিক্ষা গ্রহণ
করি না। তারপরও আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি না।
প্রিয় রাসুলে আরাবি (স) সালাতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে পানি জমিয়ে
ফেলতেন। তাঁকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে রাসুল(স)
জবাব দেন, আমি কি আল্লাহর শুকরগুজার বান্দা হবো না?
হায় আফসোস! কতোবড়ো কথা! দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ট মানব যদি এভাবে
শুকরিয়া আদায় করেন, তাহলে আমরা এত গুনাহগার হওয়ার পরেও যে
আরশের মালিক আমাদের এত নেয়ামত দিয়ে বেষ্টন করে রেখেছেন, সেই
আমাদের কতোটা শুকরিয়া আদার করা উচিত তাঁর কাছে?
মহান রবের কাছে তাঁর দেওয়া নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও আমাদের পাপাচারের
জন্য বেশি বেশি ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় নেই। না জানি তিনি আমাদের
পাকড়াও করে ফেলেন! গতকালই তো আসামে হওয়া এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে এই দেশও কাঁপিয়ে দিয়েছেন আসমানের
মালিক। আমাদের কি ভয় হয় না?
তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গিয়েছ যে, তিনি তোমাদের স্থলের কোনো দিক ধ্বসিয়ে দেবেন না, অথবা তোমাদের উপর শিলা বর্ষণকারী বাতাস প্রেরণ করবেন না? তারপর তোমাদের জন্য কোনো কর্মবিধায়ক পাবে না। _সূরা বানী ঈসরাঈল: ৬৮
সময় এসেছে বুঝার। এই যে প্রচণ্ড দাবদাহ চলছে, এটা থেকে মুক্তি দেওয়ার
জন্য, রহমতের বৃষ্টি দেওয়ার জন্য আরশের মালিকের কাছে আমাদের কেঁদে কেঁদে ভিক্ষা
চাওয়া উচিত। যদি তিনি আমাদের দয়া করেন! তিনি যেন আমাদের জন্য তাঁর দয়াকে ক্রোধের
উপর স্থান দেন। তিনি যেন আমাদের ধ্বংস করে না দেন। আল্লাহ্ রেগে গেলে যেমন আমাদের
সাবধান করে দেন, তেমনি তাঁর ক্রোধের উপর যখন দয়াকে প্রাধান্য দেন, তখন তো তিনি
আমাদের উপর তাঁর রহমত বর্ষণ করেন।
আর তাঁর নিদর্শন সমূহের মধ্যে রয়েছে, তিনি বাতাস প্রেরণ করেন [বৃষ্টির] সুসংবাদ বহনকারী হিসেবে এবং যাতে তিনি তোমাদের তাঁর রহমত আস্বাদন করাতে পারেন এবং যাতে তাঁর নির্দেশে নৌযানগুলি চলাচল করে, আর যাতে তোমরা যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ থেকে কিছু সন্ধান করতে পার। আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও। _সূরা আর-রুম:৪৮।


0 Comments