![]() |
| স্থানীয় বাবুর্চির হাতে বড়ো চুলায় কাঠের আগুনে রান্না করা বাঞ্ছারামপুরের ঐতিহ্যবাহী গরুর মাংসের রেজালা। |
পুরান ঢাকার বাকরখানি, আর বিরিয়ানি,
চোখ করে চকচক, জিভে আনে পানি।
রাঙামাটির আনারস, কাঁঠাল, কলা,
টাঙ্গাইলের চমচম খাইতে খুব ভালা।
মুক্তাগাছার মন্ডা, শেরপুরের পায়েস,
নওগাঁয় ভালা পাই চাল সন্দেশ।
বগুড়ার দই মজা, চাঁপাইয়ের আম,
সিলেটের চা ভালো, খাসিয়ার পান।
খুলনার চুইঝাল, ঝিনাইদহ’র ধান,
চিটাংয়ের কালা ভুনা, আরো মেজ্জান।
খাবার নিয়ে আমাদের বাঙালিদের রসবোধের অন্ত নেই। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা কোনো না কোনো খাবারের জন্য বিখ্যাত। উপরে মাত্র অল্প কিছু জেলার নাম বললাম। ৬৪ জেলার নাম বলতে গেলেতো পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা বিখ্যাত খাবারের কথা লেখা যাবে। সৃষ্টি হতে পারে এক মহাকাব্য।
শুধু কি জেলা পর্যায়েই সব বিখ্যাত খাবারের আঞ্জাম? এটা ভাবলে কিঞ্চিত
ভুল হয়ে যাবে। একদম প্রান্তিক পর্যায়েও যে কত কত বিখ্যাত খাবার লুকিয়ে আছে, সেগুলো
স্থানীয়রা ছাড়া বাইরের মানুষজন খুব কমই জানে।
এই যেমন ধরুন না আমাদের এলাকার দইয়ের কথাই। গ্রাম্য অনুষ্ঠানে বাবুর্চিরা
যেই দইটা বানায়, তা যে স্বাদে, গন্ধে, গুনে-মানে প্রায় তুলনাহীন, তা ক’জনই বা জানে?
এটা নিয়ে আমি কিছুদিন আগেই আপনাদের জানানোর চেষ্টা করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছি। দই
নিয়ে আমার লেখা আর্টিক্যালটি পড়তে এখানে দেখতে পারেন।
আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে গরুর মাংসের রেজালা। চট্টগ্রামের মেজ্জান
বা খুলনার চুইঝাল দিয়ে গরুর মাংস নয়। বাঞ্ছারামপুরের আদি ও অকৃত্রিম গ্রাম্য বাবুর্চির
হাতে রান্না করা স্বর্গীয় স্বাদের গরুর মাংসের রেজালা। বাঞ্ছারামপুর ব্রাহ্মণবাড়িয়া
জেলার অন্তর্ভূক্ত সর্ব দক্ষিণের একটি উপজেলা।
বাঞ্ছারামপুরের বাবুর্চির হাতে গরুর মাংসের গল্প
বলছিলাম আমাদের বাঞ্ছারামপুরের অত্যন্ত সুস্বাদু গরুর মাংসের কথা।
আপনি হয়ত চট্টগ্রামের মেজ্জান খেয়েছেন, কালাভূনাও খেয়েছেন। বাদ রাখেননি হয়ত খুলনার
চুইঝাল দিয়ে গরুর মাংস চেখে দেখতেও। এখন পর্যন্ত যদি এগুলোকেই আপনার স্বাদে-গন্ধে সেরা
মনে হয়, তাহলে আমি প্রায় একশো ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি, আমাদের বাঞ্ছারামপুরের
স্থানীয় বাবুর্চিদের রান্না করা গরুর মাংসের রেজালা খাওয়ার ভাগ্য আপনার এখনও হয়ে উঠেনি।
এ রান্নার আবিষ্কারক কে জানি না। তবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন
বাবুর্চির হাতের রান্না প্রায় একই স্বাদের হয়ে থাকে। সেটা এক রহস্য। আপনি যদি সত্যিকারের
ভোজন রসিক হয়ে থাকেন, আর যদি রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গরুর মাংসের রেজালা
খেয়ে থাকেন, তবে আমাদের বাঞ্ছারামপুরের রেজালাটা খাওয়ার পর ঢাকার রেজালা আপনার মুখেই
রোচবেনা আর কোনোদিন, এ আমি বলে দিতে পারি।
মাংসে মসলা মেশানো হচ্ছে।
বড় ডেকচিতে প্রায় ৪০/৫০/৬০ কেজি করে মাংস একসাথে রান্না করা হয়।
এর স্বাদের গোপন রহস্যের মধ্যে একটা হতে পারে একসাথে অনেক মাংস রান্না করা। সব মসলা
একসাথে মিশিয়ে মাটির বড় এক চুলায়, কাঠের আগুনে রান্না হয় এ মাংস। আদা-রসুন, হলুদ, মরিচ,
পেঁয়াজ, গরম মসলা, লবন, তেল, পানি সব একসাথে মিশিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয় চুলায়। নিয়মিত বিরতিতে
বড় হাতা দিয়ে একজন নাড়তে থাকেন। অতিরিক্ত আর কিছুই দেওয়া হয় না। ঘন্টা দেড়েক জ্বাল
দেওয়ার পর যখন সুঘ্রাণের সাথে সাথে প্রায় আঠালো অবস্থা চলে আসে, তখন চুলা থেকে উঠিয়ে
ফেলা হয়।
চুলায় মাংস চড়িয়ে রান্না হচ্ছে। মাঝে মাঝেই নেড়ে চেড়ে দিতে হয়।
![]() |
| চুলা থেকে উঠানোর প্রাক্কালে |
একটা কথা আছে, “ঘ্রানং অর্ধনং ভোজনং”, অর্থাৎ ঘ্রাণেই পেট অর্ধেক ভরে যায়। মনে হবে কথাটি বুঝি আমাদের এখানকার গরুর রেজালাটির জন্যই তৈরি হয়েছে। এর মন মাতানো ঘ্রাণ এবং আঠালো ও রসালো অবস্থা দেখে দেহ মন ভরে উঠে এক অপার্থিব আনন্দে। আপনার জিভের পানি এবং গলার ঢোক গেলা ধরে রাখতে আপনাকে হিমশিম খেতে হবে বিলক্ষণ।
![]() |
| রান্না শেষে চুলা থেকে চুলা থেকে মাংস উঠানো হয়েছে। |
প্লেটে দুই-চার টুকরো মাংস নিয়ে খেয়ে আপনি মজা পাবেন না। এ মাংস খেতে হয় প্লেট ভরে। আপনি ভাতের চামচে এক চামচ ভাত নেবেন, সাথে ২৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম মাংস একবারে পাতে ঢেলে নেবেন। এক লোকমা ভাতে কখনো একটা আস্ত মাংসের টুকরো, বা অর্ধেক ছিড়ে একবারে মুখে পুরে দেবেন। মুখ বন্ধ করে যখন চিবুতে শুরু করবেন, মসলাদার মোলায়েম মাংসের স্বাদ, আপনার ভেতর না থাকলেও একটা ভোজন রসিক স্বত্বাকে জাগিয়ে তুলবে। এলাকার কিছু কিছু মানুষতো এক বসায় এক-দুই কেজি মাংস খেয়ে উঠে।
![]() |
| রান্না করা গরুর মাংস। |
খাবার নিয়ে কোনো কাব্য লেখা হয় কি? প্রেমের কাব্য? অথবা গদ্য-উপন্যাস-গল্প? আমার জানা নেই। তবে আমি যদি লেখক হতাম তাহলে খাবারকে ঘিরেই আমার লেখনী-গাঁথা গড়ে উঠতো। প্রেমিকার মদির চোখে তাকিয়ে থাকার চেয়ে, মসলাদার সুগন্ধী রসালো খাবারের দিকে তাকিয়ে থাকাতেই আমার বেশি প্রেম। খাবারের প্রতি এক ভোজনরসিকের মায়াময় প্রেম।
কাজী নজরুল যদি এই রেজালা খেতেন, তিনি হয়ত তাঁর প্লেটের দিকে তাকিয়ে
গেয়ে উঠতেন,
নাচিছে হিয়া দেহেরও মাঝে,
ছলিছে আঁখি, রক্তিম সাঁঝে।
মন মাতানো সুবাস ঝাঁঝে,
হিয়ারও মাঝে কিঙ্কর বাজে।













0 Comments